অপসংস্কৃতি বনাম ঈমানি স্বাতন্ত্র্য: থার্টি-ফার্স্ট নাইট ও মুসলিম উম্মাহর করণীয়

​থার্টি-ফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের নামে প্রচলিত অপসংস্কৃতি কীভাবে আমাদের ঈমানি স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করছে? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই রাতের বিধান এবং সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় রোধে মুসলিম উম্মাহর করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এই নিবন্ধে।

অপসংস্কৃতি বনাম ঈমানি স্বাতন্ত্র্য:
থার্টি-ফার্স্ট নাইট ও মুসলিম উম্মাহর করণীয়


ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; বরং এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক আচরণ, সামাজিক রীতিনীতি, এমনকি আনন্দ ও উৎসব সবকিছুই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হওয়াই ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اليَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।”
সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩

এই পরিপূর্ণ দীনের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় বর্তমান যুগে ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইট’ বা ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের নামে মুসলিম সমাজে যে বিজাতীয় অপসংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে, তা ঈমানি স্বাতন্ত্র্য, নৈতিকতা ও সামাজিক শান্তির জন্য গভীর হুমকি।

থার্টি-ফার্স্ট নাইট আদতে কোনো ধর্মীয় বা মানবিক উৎসব নয়; এটি খ্রিস্টান-ইউরোপীয় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারভিত্তিক একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন, যার সাথে মুসলিম উম্মাহর আকিদা, ইতিহাস কিংবা ইবাদতের কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও দুঃখজনকভাবে মুসলিম সমাজে এই রাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, ফানুস, গান-বাজনা, বেহায়াপনা, অপচয় ও বিশৃঙ্খলা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

মদিনার আদর্শ ও উৎসবের ঈমানি স্বাতন্ত্র্য

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাদানি জীবন আমাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। হিজরতের পর তিনি দেখলেন, মদিনার লোকেরা বছরে দুটি দিন উৎসব পালন করে। তখন তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করলেন

إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا
“আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দুই দিনের পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুই দিন নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”
সুনানে আবি দাউদ

এই দুই দিন হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।
এখান থেকে স্পষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায় যে, মুমিনের আনন্দ-উৎসব হবে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত; সমাজ বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাপে গড়ে ওঠা কোনো সংস্কৃতি নয়।

আজ ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই স্লোগানটি শোনা যায়। বাহ্যিকভাবে এটি সহনশীল মনে হলেও বাস্তবে এটি ইসলামের ঈমানি স্বাতন্ত্র্যের বিরুদ্ধে যায়। কারণ ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীলতা শেখায়, কিন্তু তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুকরণ অনুমোদন করে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে বলেছেন

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।”
সুনানে আবি দাউদ,

ফাতাওয়া আলমগীরীসহ বহু ফিকহি কিতাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে
কাফিরদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ, শুভেচ্ছা জানানো বা সে উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করা হারাম।

উৎসবের নামে মানবিক ও সামাজিক বিপর্যয়

থার্টি-ফার্স্ট নাইটকে অনেকে ‘নিরীহ আনন্দ’ বলে প্রচার করলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই রাত ঘিরে অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের অসংখ্য নজির রয়েছে।

আতশবাজি ও ফানুস থেকে প্রতি বছর ঘরবাড়ি পুড়ে যায়, মানুষ দগ্ধ হয়, ব্যবসা ধ্বংস হয়। উচ্চ শব্দে অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুদের চরম কষ্ট হয়। হাসপাতালগুলোতে হার্ট অ্যাটাক ও শব্দজনিত সমস্যার হার বেড়ে যায়। পাখি ও প্রাণিকুল আতঙ্কে মারা যায় যা এক নির্মম বাস্তবতা।

ইসলাম এই ধরনের কষ্ট ও ক্ষতিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজে ক্ষতি করবে না, অন্যকেও ক্ষতি করবে না।”
সুনান আল-কুবরা লিল-বায়হাকী

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন

وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“অপচয় করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।”
সূরা আল-আনআম, আয়াত ১৪১

আর অন্য আয়াতে বলেছেন

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।”
সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৭

লক্ষ লক্ষ টাকা পটকা ও আতশবাজিতে পুড়িয়ে দেওয়া যেখানে দরিদ্র, এতিম ও অসহায় মানুষ অভাবে দিন কাটায় এটি নিছক আনন্দ নয়; বরং শরিয়তের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট গুনাহ।

ইবাদতের নামে বিদআত

কিছু মানুষ বলেন, “আমরা তো গান-বাজনা করি না, শুধু রাত বারোটায় দোয়া করি।”
এ কথাটিও শরিয়তের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইমাম শাতিবী রহিমাহুল্লাহ বলেন

تخصيص زمان بالعبادة لم يخصصه الشرع بدعة
“যে সময়কে শরিয়ত ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করেনি, সে সময়কে বিশেষভাবে ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করা বিদআত।”

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

كُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
“প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।”
সহীহ মুসলিম

অতএব থার্টি-ফার্স্ট নাইটকে উপলক্ষ করে বিশেষ দোয়া, মাহফিল বা ইবাদত সবই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রতি আমাদের উদাসীনতা

মুসলিম উম্মাহর ইবাদত, ইতিহাস ও পরিচয় হিজরি বর্ষপঞ্জির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রমজান, হজ, ঈদ সবই হিজরি মাসের ওপর নির্ভরশীল। অথচ আমরা ইংরেজি নববর্ষ নিয়ে উচ্ছ্বসিত, কিন্তু হিজরি মাস কখন শুরু হলো তা জানার আগ্রহও রাখি না।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন,
যদি কোনো মুসলিম সমাজ সম্মিলিতভাবে হিজরি বর্ষপঞ্জি পরিত্যাগ করে, তবে তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

হাশরের ময়দানে অভিভাবকের জবাবদিহি

ইসলামে সন্তান লালন-পালন একটি আমানত। অভিভাবকের অবহেলা সন্তানের গুনাহের অংশীদার বানাতে পারে। কুরআনে এসেছে

رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا
“হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নেতৃস্থানীয় ও অভিভাবকদের অনুসরণ করেছিলাম।”
সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬৭

কিয়ামতের দিন সন্তানেরা অভিভাবকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে এই ভয়াবহ বাস্তবতা আমাদের কাঁপিয়ে দেয়। সন্তান কার অনুমতিতে বের হচ্ছে, কার টাকায় পটকা কিনছে এসবের হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।

উপসংহার

থার্টি-ফার্স্ট নাইট উদযাপন, শুভেচ্ছা বিনিময় কিংবা এ উপলক্ষে বিশেষ ইবাদত কোনোটিই ইসলামে বৈধ নয়। এটি বিজাতীয় অনুকরণ, অপচয়, বিদআত ও সামাজিক ক্ষতির সমষ্টি। একজন সচেতন মুমিনের কর্তব্য হলো ঈমানি স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা, পরিবারকে হেফাজত করা এবং সমাজকে এই অপসংস্কৃতি থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।

ইসলাম আনন্দ নিষিদ্ধ করেনি; বরং আনন্দকে শুদ্ধ করেছে। আমাদের ফিরে যেতে হবে আল্লাহ নির্ধারিত ঈমানি আনন্দের পথে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার পথে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে বুঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ট্যাগ:থার্টি-ফার্স্ট নাইটইংরেজি নববর্ষঅপসংস্কৃতিঈমানি স্বাতন্ত্র্যইসলাম ও উৎসবআতশবাজি ও ফানুসবিজাতীয় অনুকরণহিজরি বর্ষপঞ্জিমুসলিম উম্মাহর করণীয়শরিয়তের বিধান।